
আজ ২৭শে নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আন্দোলন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহীদ পলু দিবস।
১৯৮৩ সালের আজকের দিনের আন্দোলন ও দুজন শহীদের প্রাণের বিনিময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার স্বীকৃতি পায়।
বাউনবাইরার কতা গ্রুপের IntelligentBlueberry2616 এর তথ্যানুযায়ী আজকের এ দিনের কথা দুঃখজনকভাবে অনেকেই জানে না। এমনকি উইকিপিডিয়া বা বাংলাপিডিয়ার মতো জায়গাতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামটি আজ নিজস্ব জেলা হিসেবে তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং তিতাস নদীর নৈকট্যের জন্য পরিচিত। তবে এর বর্তমান স্বায়ত্ত শাসিত প্রশাসনিক ইউনিটের মর্যাদা কোনো সরকারি বিধান দ্বারা কেবল নিশ্চিত হয়নি বরং একটি উজ্জীবিত গণআন্দোলনের মাধ্যমে যা প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে শহিদত্বের মধ্য দিয়ে করুণ পরিণতির দিকে গিয়েছিল।
১৯৮০–এর দশকের শুরুর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার একটি মহকুমা। প্রশাসনিকভাবে এই ব্যবস্থাটি প্রায়ই স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসনের অভাব এবং ধীর উন্নয়নের কারণ ছিল। কারণ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং উচ্চ-পর্যায়ের দায়িত্বগুলো কুমিল্লায় কেন্দ্রীভূত ছিল। ১৯৮০–এর দশকের শুরুতে, এইচ. এম. এরশাদের সরকার বড় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করলে মহকুমাগুলোকে পূর্ণ জেলা হিসেবে উন্নীত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এই পদক্ষেপকে সাধারণত প্রশাসনকে মানুষের নিকটবর্তী করা এবং আঞ্চলিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। যখন কেন্দ্রীয় সরকার উন্নীতকরণের পরিকল্পনা করছিল, তখন পিতৃজেলা কুমিল্লার স্থানীয় নেতা ও প্রশাসকেরা সমৃদ্ধ ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা হারানোর ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়, যা তাৎক্ষণিক ও নিঃশর্ত জেলা স্বীকৃতির দাবিতে রূপ নেয়। আন্দোলন দ্রুত ছাত্র, স্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে। বিরোধের মূল বিষয়টি ছিল সরকারি হস্তান্তর এবং নতুন প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার তারিখ ও রূপ। সংকট তীব্র হতে থাকে এবং নভেম্বর ১৯৮৩–তে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে।
১৯৮৩ সালের শেষ দিকে মহকুমা হতে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে জেলায় রূপান্তরের লক্ষ্যে তৎকালীন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের নিকট দাবি জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরামর্শক্রমে পর্যায়ক্রমিক বিভিন্ন ধরনের টানা কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেন। তাদের সাথে একাত্ম হয় সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন। এতে বিচলিত হয়ে সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মহকুমা হতে থানায় অবনমিত করায় সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর।
নভেম্বর মাসে দিনের পর দিন জুড়ে দিবারাত একটানা হরতালে অচল হয়ে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব অফিস। ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। সংবাদপত্রে গুরুত্ব সহকারে ছাপা হতে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা আন্দোলনের কর্মসূচি। দিন রাত সড়ক জুড়ে অবস্থান নেয় আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্র জনতার ভীর। ২৭ নভেম্বর দিন হরতাল চলাকালে সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। ছাত্র জনতার অবস্থানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং রেলওয়ে স্টেশন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এদিন সকালে রেলওয়ে স্টেশনে জনতার সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলাকালে রেলব্রিজে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিক্ষিপ্ত গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে শাহাদাৎ বরণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র ওবায়দুর রউফ পলু। ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্র জনতা রেলওয়ে স্টেশন, সিও অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে। ছাত্র জনতা কেড়ে নেয় ওবায়দুর রউফ পলু’র লাশ। দুপুরে শোকাবহ পরিবেশে নিয়াজ মুহাম্মদ হাই স্কুল মাঠে লক্ষ মুসল্লীর অংশগ্রহণে জানাজার পর শহরতলীর শেরপুর কবরস্থানে পলুর দাফন সম্পন্ন হয়। এরই মধ্যে শহরে সশস্ত্র অবস্থান নেয় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট হতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আগত সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান। রাতে শহরের বিভিন্ন মহল্লায় রেইড দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে ঐতিহাসিক জেলা আন্দোলনের অনেক নেতাকে। ২৮ নভেম্বর সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ চালু হয়। এর ভিত্তিতে ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নিয়াজ মুহাম্মদ স্টেডিয়ামে বিশাল জনসভায় রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ গুরুত্ববহ ভাষণে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ৪৫টি মহকুমাকে জেলায় রূপান্তরের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন ।
স্থানীয় ঐতিহাসিক বিবরণে বিশেষভাবে উল্লেখিত দুই ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন—
• শহীদ ওবাইদুর রউফ পুলু : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র, আন্দোলনের প্রধান শহীদ ও নেতা হিসেবে পরিচিত।
• শহীদ মাসুম : আরেক স্থানীয় ব্যক্তি যার ত্যাগ আন্দোলনকে দৃঢ় করে।
শহীদদের উত্তরাধিকার আজও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাগরিক স্মৃতিতে গভীরভাবে অঙ্কিত—
• শহীদ পলু সড়ক : জেলা আদালতের নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি কোর্ট রোড নামে পরিচিত। এটি শহীদ পলু সড়ক নামে নামকরণ করা হয়।
• বার্ষিক স্মরণাঞ্জলি : প্রতি বছর ২৭ নভেম্বর স্থানীয়ভাবে জেলা আন্দোলন দিবস এবং শহীদ পলু দিবস হিসেবে পালিত হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সৃষ্টির আন্দোলন স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই অঞ্চলের প্রশাসনিক উন্নয়ন ও স্বায়ত্ত শাসন মহৎ সংগ্রাম এবং মানবজীবনের ত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল। এই ইতিহাসকে অঞ্চলটির প্রাক্তন পিতৃজেলা কুমিল্লা থেকে আলাদা পরিচয় বজায় রাখার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।